ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাত: ১৯৫৩ থেকে বর্তমান পর্যন্ত এক দীর্ঘস্থায়ী ছায়াযুদ্ধের ইতিহাস

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধবিমান ও ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার দৃশ্য

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে এই উত্তেজনা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা মূলত গত সাত দশক ধরে চলে আসা এক দীর্ঘস্থায়ী ছায়াযুদ্ধ, প্রক্সি সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের এক পুঞ্জীভূত বিস্ফোরণ। এই ত্রিমুখী সংঘাতের শেকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের পাতাগুলোতে।

শত্রুতার বীজ: ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের এই বৈরী রূপ শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। ওই সময় ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক দেশের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ মদতে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো হয়। এই ঘটনাটি ইরানি জনগণের মনে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এক গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে মার্কিন-সমর্থিত শাহের পতন ঘটে। ইরান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে 'বড় শয়তান' (Great Satan) ও ইসরায়েলকে 'ছোট শয়তান' হিসেবে আখ্যায়িত করে। তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট (যা ৪৪৪ দিন স্থায়ী হয়েছিল) দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ককে চিরতরে ছিন্ন করে দেয়। একই সাথে, ইরান ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে।

ছায়াযুদ্ধ এবং 'প্রতিরোধ অক্ষ' (Axis of Resistance) গঠন

আশির দশক থেকেই এই সংঘাত সরাসরি রণক্ষেত্রের বদলে ছায়াযুদ্ধে (Shadow War) রূপ নেয়। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেয়, যা ইরানের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় ইরান একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করে, যা 'অ্যাক্সিস অফ রেজিসটেন্স' বা প্রতিরোধ অক্ষ নামে পরিচিত। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় জন্ম নেয় 'হিজবুল্লাহ'। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের 'হামাস' ও 'ইসলামিক জিহাদ', ইয়েমেনের 'হুথি' বিদ্রোহী এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে ইরান আর্থিক, সামরিক এবং কৌশলগত সমর্থন দিয়ে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

পারমাণবিক সংকট এবং গোয়েন্দা যুদ্ধ

২০০০-এর দশকের শুরু থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইসরায়েলের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। ইরান সবসময় দাবি করে এসেছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

এই পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র এক গোপন গোয়েন্দা যুদ্ধ শুরু করে। ২০১০ সালে 'স্টাক্সনেট' (Stuxnet) নামক এক ভয়াবহ কম্পিউটার ভাইরাসের মাধ্যমে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় সাইবার হামলা চালানো হয়, যা ইরানের সেন্ট্রিফিউজগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। এছাড়া, গত এক দশকে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে গুপ্তহত্যার শিকার হতে হয়েছে, যার পেছনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হাত রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়।

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা

২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের আমলে ইরানের সাথে ছয় পরাশক্তির 'জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন' (JCPOA) বা পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর 'সর্বোচ্চ চাপ' (Maximum Pressure) প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

উত্তেজনার শিখরে: কাসেম সোলেইমান হত্যাকাণ্ড

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে এই ছায়াযুদ্ধ এক বিপজ্জনক মোড় নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ড্রোন হামলায় ইরাকের বাগদাদে নিহত হন ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার এবং আইআরজিসি-এর কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানি। তিনি ছিলেন ইরানের আঞ্চলিক কৌশল এবং প্রতিরোধ অক্ষের মূল স্থপতি। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি 'আইন আল-আসাদ'-এ ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালায়। এটি ছিল দশকের পর দশক ধরে চলা ছায়াযুদ্ধে প্রথমবারের মতো দুই দেশের সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঘটনা।

২০২৩-২০২৪: গাজা যুদ্ধ এবং সরাসরি সংঘাতের নতুন অধ্যায়

৭ অক্টোবর ২০২৩-এ ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিরা ইসরায়েল এবং লোহিত সাগরে পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা শুরু করে।

এই আঞ্চলিক উত্তেজনা ২০২৪ সালে এক চরম রূপ ধারণ করে:

  • এপ্রিল ২০২৪: পয়লা এপ্রিল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেট ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আইআরজিসি-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ রেজা জাহেদিসহ বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এর সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবে ১৩ এপ্রিল রাতে ইরান প্রথমবারের মতো নিজেদের ভূখণ্ড থেকে সরাসরি ইসরায়েলের দিকে ৩ শতাধিক ড্রোন, ক্রুজ এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জর্ডানের সহায়তায় ইসরায়েল এর বেশিরভাগই আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
  • অক্টোবর ২০২৪: জুলাই মাসে তেহরানে হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়াহ এবং সেপ্টেম্বরে বৈরুতে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করে ইসরায়েল। এর চরম প্রতিশোধ নিতে ১ অক্টোবর ইরান প্রায় ১৮০টি অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল সরাসরি ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে হাইপারসনিক মিসাইলও ছিল বলে দাবি করা হয়।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা

ইসরায়েলের পাল্টা জবাব: এর কয়েক সপ্তাহ পর, অক্টোবরের শেষদিকে ইসরায়েল শতাধিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মিসাইল উৎপাদন কারখানাগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।

বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের শঙ্কা

বর্তমানে এই ত্রিমুখী সংঘাত একটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং বিপজ্জনক পর্যায়ে অবস্থান করছে। ইরান একদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অর্থনীতি সামলাচ্ছে, অন্যদিকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপক অগ্রগতি ঘটিয়েছে। ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং যেকোনো মূল্যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে বদ্ধপরিকর।

ইতিহাস সাক্ষী, এই অঞ্চলে সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গও একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। দশক ধরে চলে আসা ছায়াযুদ্ধ এখন আর পর্দার আড়ালে নেই; বরং এটি সরাসরি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং বিমান হামলার রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।


পাঠকদের প্রতি: মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আর কী কী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান এই পোস্টের নিচে কমেন্ট কর জানান, আপনার মতামত আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ!

সম্পর্কিত আরো একটি পোষ্ট পড়ুন

জুলাই শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না । প্রধান উপদেষ্টার বার্তা ও বাস্তবতার বিশ্লেষ

পোস্টটি পড়ুন

Post a Comment

Previous Post Next Post